হে বঙ্গ : কবির আয়নায় বাংলার মুখ

কবিতা বরাবরই শিল্পের মহোত্তম একটি শাখা হিসেবে পরিগণিত। কবিতা হচ্ছে শব্দের ছন্দোময় বিন্যাস। যা একজন কবির আবেগ, অনুভূতি, উপলব্ধি ও চিন্তাকে সংক্ষেপে উপমা, উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্পের সাহায্যে ফুটিয়ে তোলে। পাশাপাশি শব্দের ছন্দায়িত ব্যবহারে সুমধুর শ্রুতিযোগ্য করে তোলে। যদিও কাঠামোর বিচারে কবিতা নানা রকম। তাই যুগে যুগে কবিরা কবিতার বৈশিষ্ট্য ও কাঠামোতে পরিবর্তন এনেছেন। কবি দীপংকর দীপকও হাঁটছেন সে পথে।


বাংলা সাহিত্যে সমসাময়িক তরুণ কবিদের মধ্যে এই দীপংকর দীপক একটি বহুল উচ্চারিত নাম। তার কবিতায় মানবিক মূল্যবোধ, শ্রেণিচেতনা, সমাজ বাস্তবতা উঠে এসেছে। তার কবিতায় রস, ছন্দ, অলঙ্কার ও বৈশিষ্ট্যের সঠিক প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। পেশা জীবনে একজন সংবাদকর্মী তিনি। ফলে কবিতায় তিনি অনন্য চেতনাবাদী ও জীবনমুখী। শেকড় সন্ধানী এ কবির অন্যতম অবদান ‘হে বঙ্গ’।


৪১টি দেশাত্মবোধক কবিতা নিয়ে ‘হে বঙ্গ’ বইটি সাজানো হয়েছে। এটি তার চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ। বইয়ে স্বদেশপ্রেম, বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর কীর্তি, নারীমুক্তি, প্রকৃতিপ্রেমসহ গবেষণামূলক নানা বিষয় উঠে এসেছে। বইটিতে চতুর্দশপদী, অষ্টাদশপদী, গীতিকবিতা ও আঞ্চলিক কবিতা রয়েছে। একইসঙ্গে কবিতার দৃশ্যপটে ধর্মনিরপেক্ষতা, জীবনমুখী সংগ্রাম, প্রথাবিরোধী মনোভাব, শ্রেণিচেতনা ও সমাজ বাস্তবতা জীবন্ত উপাদান হয়ে পরিস্ফূটিত হয়েছে।


দীপংকর দীপক ‘বাংলাদেশ’ নামক কবিতায় শব্দের পাশে শব্দ বসিয়ে পুরো বাংলাদেশের একটি মানচিত্র এঁকে ফেলেছেন। কাব্যগ্রন্থে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা কবিতাগুলোও পাঠককে মুগ্ধ করবে। তার কবিতায় সাহিত্যের বিশেষ শক্তিমত্তা প্রকাশ পেয়েছে। তার কবিতায় দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট উঠে এসেছে। ‘বাংলাদেশ’ কবিতায় বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সমৃদ্ধির কথা তুলে ধরেছেন। কবি তার কবিতায় লিখেছেন,


‘আমরা স্বাধীন, আমার নবীন; আবার আমরা-ই চিরন্তন 

মানি না শোষণ, মানি না বারণ-আমরা পথচলি অবিরাম 

আমরা কোমল, আমরা সবল; ওগো- ফুল ছেড়ে ধরি কাঁটা

অধিকার আদায়ে রাজপথে নামি, করি গো বাংলাপেটা।’

এ কবিতায় বাঙালির চিরন্তন ধারা ফুটে উঠেছে। কারণ আমাদের তারুণ্য সংগ্রাম ও বিপ্লবের। আমরা কোমল আবার কঠোরও। তা এ কবিতায় কাজী নজরুলের ছায়া দেখতে পাই।


‘আমরা বাঙালি’ কবিতায় কবি বলেছেন, 

‘আমরা কাউকে করি না পরোয়া। মানি নাকো কোনো বাঁধা।

আমরা ঘাতককে করি দ্বিগুণ প্রতিঘাত। অন্যায়ে- সংঘাত।

আমাদের নাই কোনো ডর-ভয়। আমরা অজয়কে করি- জয়।’

বাঙালির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস উঠে এসেছে এ কবিতায়। বাঙালি সহজে কারো কাছে মাথা নত করে না। ঘাতককে তারা নির্মমভাবে প্রতিহত করতে পারে। বাঙালির যুগ যুগান্তরের ইতিহাস এর সাক্ষ্য বহন করে।


বাঙালি জাতির পিতা, মুক্তিযুদ্ধের অগ্রনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে কবি বলেছেন,


‘বঙ্গবন্ধু হিমালয়সম, বঙ্গবন্ধু আকাশের মতো

হাতের তালুতে সযত্নে তুলে রাখতো পুরো দেশ

কৈশোর থেকে বিজয়ীর বেশে ছুটেছেন অবিরত

পদত্যাগ নয়, দেহত্যাগে সাঙ্গ করেছেন রাজলীলা।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ছোট ছোট কবিতায় তুলে আনা অনেক কষ্টের। বরং একটি মহাকাব্য হতে পারে। কেননা তার বর্ণীল জীবন দু’চার লাইনে ব্যাখ্যা করা যায় না। প্রগাঢ় ব্যক্তিত্ব, পরিশীলিত রাজনীতি, উদার পন্থা যে মানুষটিকে হিমালয় বানিয়েছে। সেই মানুষটিকেই আমরা নির্মমভাবে হত্যা করেছি। তবুও তিনি আমাদের বঙ্গবন্ধু। আকাশের মতো উদার।


রাজনীতি, দেশপ্রেমের পাশাপাশি ইতিহাসও তুলে এনেছেন তার কবিতায়। ‘ও নইদ্যার চান’ শিরোনামের গীতিকবিতাটি অতীতের অনেক ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়। ইতিহাস থেকে উপাদান নিয়ে তিনি বর্তমানকে তুলে এনেছেন কবিতায়। কবি বলেছেন,


‘সাক্ষী রইল চন্দ্র-সূর্য, সাক্ষী রইল তারা

ভালোবেসে যাবো তোমায়, মাথার দিলাম কিরা।

এই রিদয় তোমার রইল, রইবে চিরদিন

ফিইর্যা যাও ঘরে তুমি, এ মোর বন্দন।।’

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অপার দৃষ্টান্ত আমাদের দেশ। তবুও মাঝে মাঝে হায়েনার আঘাত আসে। আমাদের সম্প্রীতি ভাঙনের চেষ্টা করা হয়। সে দিকে ইঙ্গিত করেই কবি এমন ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তবে ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়টি তুলে ধরে কবি বলেছেন, 

‘মোরা ষোলো কোটি জনতা, জানে বিশ্বের সবাই 

আমরা-এক থালায় খাই, এক-ই গান গাই এক সুরে বলি কথা

ভেদাভেদ- নাহি মানি, শোনো ভাই

এমন অতিথিপরায়ণ জাতি-বিশ্বের আর কোথাও নাই।’


বাংলাদেশের কোন প্রেক্ষাপট বা অবস্থা বাদ যায়নি তার কবিতা থেকে। পুরাণ থেকে বর্তমান, গ্রাম থেকে শহর, পরাধীনতা থেকে স্বাধীনতা, মাটি থেকে কংক্রিট সব কিছুই এসেছে তার কবিতায়। শহরের ইট-কাঠ-লোহা পার হয়ে গ্রামীণ ঐতিহ্যও উঠে এসেছে পরম মমতায়। তাই গ্রামের পিঠাও উঠে এসেছে আপন মহিমায়। কবি বলেছেন,


‘অমৃত স্বাদে পিঠার রসে ভর ভর

মুখে দিয়ে শুধু রস গিলি বারবার।’

বাঙালির পিঠা খাওয়ার স্মৃতি কমবেশি সবারই রয়েছে। শহরকেন্দ্রিক মানুষও সময় করে বছরে অন্তত একবার শেকড়ের সন্ধানে পাড়ি জমান। গ্রামীণ ভালোবাসায় মুগ্ধ হয়ে ফিরে আসেন কংক্রিটের দেয়ালের মাঝে। তাই বলা যায়, দীপকের কবিতা পাঠে অনেক কিছুই নাড়া দেবে পাঠককে।


কবি দীপংকর দীপক কবিতার পাশাপাশি গল্পও লিখেছেন। গল্পগ্রন্থেও ব্যাপক সাড়া পেয়েছেন। ফলে তার কবিতায় গল্পেরও ছায়া খুঁজে পাওয়া যায়। বাংলা ভাষার মাধুর্যতায় আসক্ত হয়ে তিনি কাব্যচর্চা করছেন। আর মনের পিপাসা নিবারণে গল্প কিংবা উপন্যাস লিখছেন। তার কবিতায় উঠে আসে বিভিন্ন সময়ের গল্প, ইতিহাসের করুণ কিংবা গৌরবোজ্জ্বল কাহিনি। কবি ও কথাশিল্পী হিসেবে তার সার্থকতা এখানেই।


এ পর্যন্ত দীপকের ডজনখানেক বই প্রকাশিত হয়েছে। এরমধ্যে ‘বুনো কন্যা’, ‘নাস্তিকের অপমৃত্যু’ ও ‘ঈশ্বরের সঙ্গে লড়াই’ বাঙালি পাঠকমহলে বেশ প্রশংসিত হয়েছে। তাছাড়া তার সিক্যুয়াল কাব্যগ্রন্থ ‘নিষিদ্ধ যৌবন-প্রথম খণ্ড’ এবং ‘নিষিদ্ধ যৌবন-দ্বিতীয় খণ্ড’ও ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে।


সবশেষে আনন্দ ও গর্বের সঙ্গে বলতে হচ্ছে- ‘হে বঙ্গ’ বইটি বিক্রির রয়্যালিটি নারী শিক্ষা কার্যক্রমে ব্যয় করা হবে। বইটির বেশিরভাগ কবিতা বিভিন্ন বিশিষ্টজনকে উৎসর্গ করেছেন। তবে পুরো বইটি উৎসর্গ করেছেন একাত্তরের বীর শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের। আশা করি কবি দীপংকর দীপকের শ্রম সার্থক হবে।